শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০ ইং, বাংলা ১৩, অগ্রহায়ণ ১৪২৭
Creation Plus
  • অনলাইন ডেস্ক
  • ৪ সপ্তাহ আগে

অবাধে চলছে মা ইলিশ নিধন

অবাধে চলছে মা ইলিশ নিধন

বরিশালের মেঘনা নদী-সহ বরিশালের ছোট বড় প্রায় সব নদনদীতে অবাধে চলছে মা ইলিশ নিধন। স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থেকে স্থানীয় জেলেরা নদীতে জাল ফেলছে। পাশাপাশি মা ইলিশ রক্ষায় নদীতে অভিযান পরিচালনা করতে গেলে একের পর এক হামলার শিকার হচ্ছে প্রশাসনের কর্মকর্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

এতে করে মা-ইলিশ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে অসহায় হয়ে পড়েছেন মৎস্য'বিভাগের কর্মকর্তারা। ইলিশ'শিকারে নিষেধাজ্ঞা শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চারটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলায় পুলিশ সদস্যসহ অভিযান পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট ৭ জন আহত হয়েছে।

মৎস্য বিভাগ সূত্র জানায়, গতকাল মঙ্গলবার সকালে নিয়মিত টহলের অংশ হিসেবে হিজলার বদরপুর সংলগ্ন নদীতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় আকস্মিক সাত/আটটি নৌকা করে দুর্বৃত্তরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে চার রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় নৌ পুলিশের এক সদস্য আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এর আগে ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে বরিশাল সদর উপজেলার চন্দ্রমোহন ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড-সংলগ্ন কীর্তনখোলা নদী এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটে। মা ইলিশ ধরার খবর পেয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুনিবুর রহমান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসান, নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (দক্ষিণ) জাকারিয়া রহমান, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জীব সন্যামতসহ বন্দর থানার পুলিশের ১০ সদস্যের একটি দল ওই এলাকায় অভিযানে যায়।

সেখানে পৌঁছামাত্র একদল দুর্বৃত্ত তাঁদের ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীদের এলোপাতাড়ি ইটপাটকেল নিক্ষেপের কারণে অভিযান পরিচালনাকারী দলটি পিছু হটেন। হামলায় পুলিশের দুই সদস্য এবং তাঁদের বহনকারী একটি স্পিডবোটের চালক আহত হন।

এর আগে নিষেধাজ্ঞার দ্বিতীয় দিন ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাতে মেঘনার দেবুয়া এলাকায় নৌ পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশের দুই সদস্য আহত হন। তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া ১৮ অক্টোবর রবিবার মেহেন্দীগঞ্জের দুজন প্রভাবশালী ইউপি সদস্যের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনাকারী দলের ওপর আরো একটি হামলার ঘটনা ঘটে।

মৎস্য বিভাগ বলছে, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঘনা, বরিশাল সদরের চন্দ্রমোহন ইউনিয়ন-সংলগ্ন এলাকার কীর্তনখোলা নদী ইলিশের ষষ্ঠ অভয়াশ্রমের অংশ হওয়ায় প্রজননের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব এলাকায় মা ইলিশের বিচরণ বেশি হওয়ায় অসাধু জেলেরা সেখানে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মাছ ধরেন। 
প্রতিবছরই নিষেধাজ্ঞার সময় স্থানীয় প্রভাবশালী মৎস্য ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতায় জেলেরা রাতের আঁধারে নদীর এসব অংশে ব্যাপক হারে মা ইলিশ নিধন অব্যাহত রাখেন। এদের নিবৃত্ত করতে গেলেই নদীতে হামলার শিকার হচ্ছেন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

স্থানীয়রা জানান, হিজলা উপজেলার হরিণাথপুর, শাওরা সৈয়দখালী, চরকিল্লা, অন্তর্বাম, দেবুয়া, কাইসমা, ধুলখোলা, আবুপুর, গঙ্গাপুর, নাছোকাঠি-সংলগ্ন মেঘনা নদীতে চলছে মা ইলিশ নিধন। একই সঙ্গে বরিশাল সদরের চন্দ্রমোহন-সংলগ্ন নদীতে রাতের জোয়ারে প্রতিনিয়ত অবৈধ কারেন্ট জাল দিয়ে ইলিশ শিকার করে আসছে স্থানীয় একটি চক্র। সন্ধ্যা নদীর কাজলাহার, মসজিদ বাড়ি, জম্বুদ্বিপ, কালীবাড়ী, উজিরপুরের মীরের হাচ সাহেবের হাট, শিকারপুর এলাকায় চলছে অবাধে ইলিশ শিকার। তবে এসব ইলিশ শিকারী পেশাদার জেলে না হলেও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থেকে মা ইলিশ ধরছেন। এবং অভিযান পরিচালনার সময় ওইসব প্রভাবশালীদের ইন্ধনেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে।

মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন বলেন, মেহেন্দীগঞ্জের চারদিকে মেঘনার শাখা-প্রশাখা, যেখানে ব্যাপক মা ইলিশের বিচরণ। এই এলাকায় প্রভাবশালী মাছ ব্যবসায়ীরা কৌশলে শিশুদের দিয়ে ইলিশ শিকার করাচ্ছেন। শিশুদের দণ্ড দেওয়ার বিধান না থাকায় তাঁরাও বিব্রতকর অবস্থায় পড়ছেন। এমনকি তিনিও অভিযানে গিয়ে জেলেদের ধাওয়ার শিকার হয়েছেন।

নৌ পুলিশ সূত্র জানায়, ওই এলাকার বিশাল মেঘনা নদীর আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নৌ পুলিশের ১৩ জন সদস্য রয়েছেন। কিন্তু এত স্বল্পসংখ্যক পুলিশ সদস্যকে অবস্থা সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। হিজলা নৌ পুলিশের ওসি বেলল্লা হোসেন বলেন, অবস্থা বিবেচনায় এখানে পুলিশের আরো ৩৪ জন সদস্য যুক্ত হচ্ছেন। তাঁদের দুটি এলাকায় ভাগ করে ২৪ ঘণ্টা হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার আওতাধীন মেঘনার পাহারায় নিযুক্ত করা হবে।

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক আনিচুর রহমান বলেন, বিভাগীয় কমিশনার ও বরিশাল জেলা প্রশাসককে পরিস্থিতি জানানো হলে দুই উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

মা ইলিশ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা যে রাখতে পারছে না পরিচালিত অভিযান ও জেলা জরিমানার পরিসংখ্যান থেকে বুঝা যায়। ১৪ অক্টোবর থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত বরিশাল জেলার ১০ উপজেলাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে ৭৯টি। মোট মামলা দায়ের হয়েছে ৩৪৯টি।

২৯৪ জন ব্যক্তিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারা দণ্ড দেওয়া হয়েছে। ৫৫ জনের কাছ থেকে দুই লাখ ৮৬ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে প্রায় ১৮ লাখ মিটার নিষিদ্ধ কারেন্টজাল। গত ২৪ ঘণ্টায় চারটি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনার সময়ে ২১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ১৬ জনের কাছ থেকে ২৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে। এক লাখ ২২ হাজার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়েছে।

বরিশালের জেলা প্রাশাসক এস এম অজিয়ার রহমান বলেন, মা ইলিশ রক্ষার্থে ভয়ভীতি উপেক্ষা করে জাতীয় সম্পদ রক্ষার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। প্রভাবশালী হোক আর শক্তিশালী ছত্রছায়ায় থেকে যারা হামলা চালাচ্ছেন তাদের বিষয়ে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাতে সে যত প্রভাবশালীই হন না কেন। শতবাধা বিপত্তির পরেও মা-ইলিশ রক্ষায় আমরা সচেষ্ট আছি। হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।


এ জাতীয় আরো খবর